নিজস্ব প্রতিবেদক:
পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে মদ্যপানকে অনেকেই স্থানীয় সংস্কৃতির একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই চর্চা এখন শুধু সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সীমায় আবদ্ধ নেই; বরং এটি সামাজিক অবক্ষয়, স্বাস্থ্যঝুঁকি, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং আইনশৃঙ্খলাজনিত নানা সমস্যার কারণ হয়ে উঠছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।
স্থানীয়দের মতে, বান্দরবানের ঐতিহ্যবাহী রাজ পুণ্যাহ-এর মতো বিভিন্ন আয়োজনেও প্রকাশ্যে মদ বিক্রি ও সেবনের দৃশ্য এখন আর অস্বাভাবিক কিছু নয়। বহু মানুষের চোখে এটি যেন একটি স্বাভাবিক সামাজিক বাস্তবতা। তবে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—একটি সমাজের সংস্কৃতি কি এমন হতে পারে, যা ধীরে ধীরে সেই সমাজের অগ্রগতির পথকে সংকুচিত করে দেয়?
নিয়ন্ত্রণহীন মদ্যপান নিয়ে উদ্বেগ সচেতন মহলের দাবি, পার্বত্য অঞ্চলে মদ্যপানের ওপর কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় অল্প বয়সীদের মধ্যেও এ প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও শিশু-কিশোর বয়স থেকেই মদ্যপানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রকাশ্যে, উচ্চ শব্দে কিংবা দিনের যে কোনো সময় মদ্যপানের ঘটনাও স্থানীয়দের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের বহু দেশে মদ্যপান বৈধ হলেও তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। যেমন—যুক্তরাষ্ট্রে মদ্যপানের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর, আর অনেক উন্নত দেশে ১৮ বছর। অধিকাংশ দেশেই মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো কঠোরভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ। তাছাড়া খোলা জায়গায় মদ্যপান, নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে বিক্রি, কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে বিক্রি—এসব ক্ষেত্রেও রয়েছে সুস্পষ্ট বিধিনিষেধ।
‘সংস্কৃতি’ বনাম ‘সামাজিক ক্ষতি:
অনেকেই যুক্তি দেন, মদ বিক্রি স্থানীয় কিছু পরিবারের আয়ের উৎস। কিন্তু সমালোচকদের মতে, স্বল্পমেয়াদি এই আয়ের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদে সমাজকে গুনতে হচ্ছে বড় মূল্য। চিকিৎসা ব্যয়, পারিবারিক অশান্তি, কর্মক্ষমতা হ্রাস, আসক্তি, সহিংসতা এবং অপরাধ—সব মিলিয়ে এর সামাজিক খরচ অনেক বেশি।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, মদের পাশাপাশি ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকও কিছু এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলছে। শুধু পাহাড়ি অঞ্চলেই নয়, এখানকার মদ চট্টগ্রামসহ সমতলের বিভিন্ন এলাকাতেও সরবরাহ হচ্ছে বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ।
ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ:
স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অনেকের মতে, মদ বিক্রি ও সেবন ধর্মীয় নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। বৌদ্ধ ধর্মে মদ্যপানকে অনৈতিক আচরণের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং মদ বিক্রিও নিরুৎসাহিত পেশার মধ্যে পড়ে। ফলে সংস্কৃতির নামে এই চর্চা ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গেও বিরোধ তৈরি করছে বলে মত দিয়েছেন অনেকে।
দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ:
সচেতন মহলের অভিযোগ, অনিয়ন্ত্রিত মদ ব্যবসাকে ঘিরে একটি অস্বচ্ছ অর্থনৈতিক চক্র গড়ে উঠেছে, যেখানে অসাধু কিছু ব্যক্তি ও প্রভাবশালী মহল লাভবান হচ্ছে। ফলে মদকে কেন্দ্র করে সামাজিক ক্ষতির পাশাপাশি দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রও তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিষিদ্ধ নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের দাবি:
অনেকেই মনে করছেন, একেবারে নিষিদ্ধ করার চেয়ে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা চালু করা বাস্তবসম্মত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি সুপারিশ সামনে এসেছে—
👉মদ্যপানের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করা,
👉লাইসেন্স ছাড়া উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ করা,
👉নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও নির্দিষ্ট স্থানে সীমিত বিক্রির অনুমতি দেওয়া,
👉বাইরের লোকজনের কাছে বিক্রি নিষিদ্ধ করা,
👉মদ্যপ অবস্থায় যানবাহন চালনায় কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা,
👉বিক্রি থেকে প্রাপ্ত কর বা ফি শিক্ষা, লাইব্রেরি ও সামাজিক উন্নয়নে ব্যয় করা,
👉ব্যক্তিপ্রতি নির্দিষ্ট সীমার বেশি সেবন বা ক্রয়ের ওপর নজরদারি চালু করা,
👉অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন সামাজিক সংস্কার,
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, একটি জাতিগোষ্ঠী বা অঞ্চলকে এগিয়ে নিতে হলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আত্মসমালোচনা ও সামাজিক সংস্কার জরুরি। যে সংস্কৃতি সমাজকে এগিয়ে নেয়, তা টিকিয়ে রাখা উচিত; আর যা উন্নয়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, তা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অনেকে উদাহরণ টেনে বলেন, একসময় ভারতের মিজোরাম-ও পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর একটি ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা শিক্ষা, সামাজিক শৃঙ্খলা ও জনসচেতনতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। আজ মিজোরামকে ভারতের অন্যতম শিক্ষিত ও সচেতন রাজ্য হিসেবে দেখা হয়।
শেষ কথা:
পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পরিচয় নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের এক অমূল্য সম্পদ। তবে সেই ঐতিহ্যের আড়ালে যদি এমন কোনো চর্চা বিস্তার লাভ করে, যা সমাজকে পিছিয়ে দেয়—তবে তা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলে মনে করছেন সচেতনরা।
তাদের ভাষ্য, মদকে ‘সংস্কৃতি’ নয়, ‘নিয়ন্ত্রণযোগ্য সামাজিক বাস্তবতা’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নতুবা উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতার পথে পার্বত্য সমাজ আরও পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি, এম নজরুল ইসলাম খান,, সম্পাদক ও প্রকাশক,সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার আমীরি,
Copyright © 2026 DAILY ALOKITO SOMAJ. All rights reserved.