মুখস্থবিদ্যার সনাতন পরীক্ষা নয়; প্রয়োজন দক্ষতাভিত্তিক, শিশুবান্ধব ও যুগোপযোগী জাতীয় মূল্যায়ন ব্যবস্থা।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার প্রাথমিক শিক্ষার ভিত কতটা শক্তিশালী, তার ওপর। কারণ প্রাথমিক স্তরেই শিশুর ভাষা, গণিত, যুক্তিবোধ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও জীবনদক্ষতার ভিত্তি গড়ে ওঠে। ফলে প্রাথমিক শিক্ষার মান নিশ্চিত করা কেবল শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্ব নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণের অন্যতম প্রধান শর্ত। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ ও উপবৃত্তি প্রদানের মতো ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত থেকে গেছে—প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ প্রতিটি শিশু কি সত্যিই প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করছে?
এই প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য উত্তর পেতে হলে একটি অভিন্ন জাতীয় মূল্যায়ন কাঠামো অপরিহার্য। কারণ কেবল শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি, বই বিতরণ কিংবা পাসের হার দিয়ে শিক্ষার প্রকৃত মান নির্ধারণ করা যায় না। জানা দরকার, শিশুরা বাস্তবে কতটুকু শিখছে, কতটুকু বুঝছে এবং তাদের শেখার ঘাটতি কোথায় রয়ে যাচ্ছে। আর সে কারণেই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী—পিইসি বা পিএসসি—পরীক্ষাকে নতুনভাবে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
পিইসি চালুর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দেশের সব শিক্ষার্থীকে একটি অভিন্ন মানদণ্ডে মূল্যায়নের আওতায় আনা। এর মাধ্যমে সরকার ও নীতিনির্ধারকেরা জানতে পারতেন কোন জেলা, উপজেলা বা বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান ভালো, কোথায় দুর্বলতা রয়েছে এবং কোথায় অতিরিক্ত সহায়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও পড়াশোনার প্রতি একটি দায়িত্ববোধ তৈরি হয়েছিল। বিদ্যালয়গুলোও ফলাফলের দিকে নজর রাখত, এবং জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার মান সম্পর্কে একটি তুলনামূলক চিত্র পাওয়া যেত। পিইসি বাতিলের পর সেই অভিন্ন মূল্যায়ন কাঠামো ভেঙে পড়েছে। এখন শিক্ষার্থীরা শ্রেণি উত্তীর্ণ হলেও তারা প্রকৃতপক্ষে কতটুকু শিখছে, তার নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়ন অবশ্যই প্রয়োজনীয়; কিন্তু সেটি জাতীয় মান নির্ধারণের বিকল্প হতে পারে না। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, দেশের সব বিদ্যালয়ে একই মানদণ্ডে মূল্যায়ন হচ্ছে না। কোথাও মূল্যায়ন কঠোর, কোথাও শিথিল; কোথাও শিক্ষকরা আন্তরিক, কোথাও মূল্যায়ন প্রক্রিয়াই দুর্বল। ফলে জাতীয়ভাবে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখার অবস্থান নির্ণয় করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষা পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণে। কোন অঞ্চলে ভাষা শিক্ষায় দুর্বলতা, কোথায় গণিতে সমস্যা, কোথায় শিক্ষক প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে, কিংবা কোন বিদ্যালয়কে বিশেষ সহায়তা দিতে হবে—এসব বিষয়ে নির্ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য যে তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন দরকার, বর্তমানে তার বড় ঘাটতি রয়েছে।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—তাহলে কি আগের পদ্ধতির পিইসি পরীক্ষা হুবহু ফিরিয়ে আনতে হবে? এর উত্তর হলো, না; কিন্তু একটি জাতীয় সমাপনী মূল্যায়ন কাঠামো অবশ্যই ফিরিয়ে আনতে হবে, এবং তা হতে হবে আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত, শিশুবান্ধব ও দক্ষতাভিত্তিক। অতীতের পিইসি নিয়ে সবচেয়ে বড় সমালোচনা ছিল, এটি অনেক ক্ষেত্রে মুখস্থনির্ভর, সনদকেন্দ্রিক এবং অল্প বয়সী শিক্ষার্থীদের ওপর চাপসৃষ্টিকারী হয়ে উঠেছিল। কাজেই নতুনভাবে পিইসি পুনঃপ্রবর্তনের অর্থ পুরোনো কাঠামোর পুনরাবৃত্তি নয়; বরং একটি যুগোপযোগী জাতীয় মূল্যায়ন ব্যবস্থার প্রবর্তন, যার উদ্দেশ্য হবে শিশুকে ভয় দেখানো নয়, বরং তার শেখার বাস্তব অবস্থান চিহ্নিত করা।
এই নতুন মূল্যায়ন ব্যবস্থায় গুরুত্ব দিতে হবে পাঠ বুঝে পড়ার সক্ষমতা, মৌলিক গণিত ও যৌক্তিক চিন্তা, নিজের ভাষায় ভাব প্রকাশের ক্ষমতা, বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং সৃজনশীল চিন্তাকে। অর্থাৎ প্রশ্নপত্র এমন হতে হবে, যাতে শিক্ষার্থী শুধু মুখস্থ করে উত্তর না লিখে, বরং বুঝে, বিশ্লেষণ করে এবং নিজের চিন্তা প্রয়োগ করে উত্তর দিতে পারে। পরিস্থিতিভিত্তিক, বিশ্লেষণধর্মী ও দক্ষতাভিত্তিক প্রশ্নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর প্রকৃত শেখার মান যাচাই করা সম্ভব। একই সঙ্গে পরীক্ষাকে প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং কোচিংনির্ভরতা নিরুৎসাহিতকারী কাঠামোয় আনতে হবে, যাতে এটি কেবল একটি পরীক্ষাই না হয়ে জাতীয় শিক্ষা-মানচিত্র তৈরির কার্যকর উপকরণে পরিণত হয়।
একটি যুগোপযোগী পিইসি পরীক্ষা কেবল শিক্ষার্থীর ফল নির্ধারণের জন্য নয়; এটি জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবেও কাজ করতে পারে। এর মাধ্যমে সরকার জানতে পারবে কোথায় শিক্ষকসংকট রয়েছে, কোথায় প্রশিক্ষণের প্রয়োজন বেশি, কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে এবং কোন বিদ্যালয় বা অঞ্চলকে বিশেষ সহায়তা দিতে হবে। অভিভাবকরাও বুঝতে পারবেন, তাঁদের সন্তান কেবল পরবর্তী শ্রেণিতে উঠছে, নাকি সত্যিকার অর্থে শিখছে। অর্থাৎ এই মূল্যায়নব্যবস্থা শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বিদ্যালয়, অভিভাবক এবং নীতিনির্ধারক—সবার জন্যই একটি জবাবদিহিমূলক কাঠামো তৈরি করতে পারে।
পিইসিকে অতীতে যেভাবে শুধু একটি সনদভিত্তিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হয়েছিল, ভবিষ্যতে সেই সংকীর্ণ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এটি হতে পারে শিক্ষার গুণগত মান যাচাইয়ের একটি বৈজ্ঞানিক উপায়, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করার নির্ভরযোগ্য মাধ্যম এবং শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়নের তথ্যভিত্তিক ভিত্তি। শিক্ষার্থীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি না করে, কোচিংনির্ভরতা কমিয়ে, প্রশ্নব্যাংক উন্নয়ন, দক্ষ মূল্যায়নপদ্ধতি এবং ফলাফলের বিশ্লেষণভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে পিইসিকে একটি কার্যকর জাতীয় মূল্যায়ন ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটি দক্ষ, জ্ঞানভিত্তিক ও স্মার্ট রাষ্ট্র গড়তে চায়, তবে প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়মিত ও বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়নের বিকল্প নেই। তাই সময়ের দাবি হলো—প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা পুনঃপ্রবর্তন করা; তবে অতীতের সীমাবদ্ধতা নিয়ে নয়, বরং শিশুবান্ধব, দক্ষতাভিত্তিক, স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি জাতীয় মূল্যায়ন কাঠামো হিসেবে। কারণ যে জাতি তার প্রাথমিক শিক্ষার মান সঠিকভাবে পরিমাপ করতে পারে না, সে জাতি ভবিষ্যতের মানবসম্পদও সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারে না। আর সেই কারণেই প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে পিইসি পুনঃপ্রবর্তন এখন সময়ের দাবি।
(লেখক: শিক্ষক ও সাংবাদিক)
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি, এম নজরুল ইসলাম খান,, সম্পাদক ও প্রকাশক,সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার আমীরি,
Copyright © 2026 DAILY ALOKITO SOMAJ. All rights reserved.