প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা: ফিরে আসুক নতুন মূল্যায়ন ব্যবস্থায়
--এম. নজরুল ইসলাম খান
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা (পিইসি) পুনঃপ্রবর্তনের আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে। বিষয়টি নিছক একটি পরীক্ষা চালু বা বন্ধের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাথমিক শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীর শিখন-অর্জন এবং জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার অগ্রগতি পরিমাপের প্রয়োজন। অতীতে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একটি অভিন্ন জাতীয় মূল্যায়নের আওতায় আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সরকারি নীতিমালাতেও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত শিক্ষাক্রম অনুযায়ী এই পরীক্ষার কাঠামো ও বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে অভিজ্ঞতা বলছে, পরীক্ষা যদি শিক্ষার উদ্দেশ্যের পরিবর্তে নম্বর, জিপিএ, র্যাংকিং, কোচিং ও মুখস্থবিদ্যার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তাহলে তা শিশুর স্বাভাবিক শেখার আনন্দকে ব্যাহত করতে পারে। প্রাথমিক বয়সের শিশুর ওপর অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপ তৈরি করাও কাম্য নয়। তাই পরীক্ষা পুনঃপ্রবর্তনের আগে আমাদের ভাবতে হবে—আমরা কি পুরোনো পরীক্ষাব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনতে চাই, নাকি একটি নতুন ও আধুনিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই?
একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষা কেবল তথ্য মুখস্থ করার শিক্ষা নয়। একটি শিশু কী জানে, তার পাশাপাশি সে কতটা বুঝেছে, যুক্তি প্রয়োগ করতে পারে কি না, সমস্যা সমাধান করতে পারে কি না, শেখা বিষয় বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারে কি না—এসবই শিক্ষার প্রকৃত অর্জনের অংশ। বাংলাদেশের প্রাথমিক স্তরের বর্তমান মূল্যায়ন নির্দেশিকাতেও মূল্যায়নকে কাঠামোবদ্ধ ও শিখনভিত্তিক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অতএব, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা পুনঃপ্রবর্তন হলে সেটি হওয়া উচিত শিখনফলভিত্তিক, দক্ষতাকেন্দ্রিক, শিশুবান্ধব ও বৈজ্ঞানিক। ধারাবাহিক মূল্যায়ন, বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়ন এবং জাতীয় পর্যায়ের সমাপনী মূল্যায়নের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা যেতে পারে। এতে জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন-অর্জনের একটি নির্ভরযোগ্য চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কোন বিষয়ে বা কোন অঞ্চলে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে আছে, কোথায় অতিরিক্ত সহায়তা প্রয়োজন—সেসবও চিহ্নিত করা যাবে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরীক্ষার ফলাফলকে শাস্তির হাতিয়ার না বানানো। কোনো বিদ্যালয় বা শিক্ষককে শুধু ফলাফলের ভিত্তিতে বিচার না করে ফলাফলকে শিক্ষার দুর্বলতা শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার উপায় হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। জাতীয় মূল্যায়নের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে রায় দেওয়া নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা।
একই সঙ্গে শিক্ষকের ভূমিকা পুনর্বিবেচনা জরুরি। শিক্ষক শুধু পাঠদানকারী নন; তিনি শিক্ষার্থীর Leader, Mentor, Facilitator, Guide, Researcher, Coach, Counselor, Advisor ও Evaluator। তাই আধুনিক মূল্যায়ন ব্যবস্থার সঙ্গে শিক্ষকদের মূল্যায়ন-দক্ষতা, শিশুমনোবিজ্ঞান এবং শিখনফলভিত্তিক শিক্ষাদানের ওপর যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, পরীক্ষা শিক্ষার লক্ষ্য নয়; পরীক্ষা শিক্ষার অগ্রগতি বোঝার একটি মাধ্যম। একটি শিশু ভুল করবে, প্রশ্ন করবে, পরীক্ষা করবে, আবার চেষ্টা করবে—এই স্বাভাবিক শেখার প্রক্রিয়াকে মূল্যায়ন ব্যবস্থার ভেতরে জায়গা দিতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা যদি ফিরে আসে, তবে তা যেন পুরোনো পরীক্ষাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি না হয়; বরং হয়ে ওঠে এমন এক আধুনিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা, যেখানে শিশুর মুখস্থশক্তির চেয়ে চিন্তাশক্তি, নম্বরের চেয়ে শিখন এবং প্রতিযোগিতার চেয়ে বিকাশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি, এম নজরুল ইসলাম খান,, সম্পাদক ও প্রকাশক,সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার আমীরি,
Copyright © 2026 DAILY ALOKITO SOMAJ. All rights reserved.