ঢাকা ০২:১৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আইন হাতে তুলে না নিয়ে বিচার চাই – ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায়,,, খন্দকার মো. জসীম উদ্দিন: কলাম লেখক




 

ধর্ষণ। শব্দটা উচ্চারণ করতেই গা শিউরে ওঠে।
এটা কোনো ভুল না, এটা পশুত্ব। এর কোনো অজুহাত নেই, কোনো তুলনা নেই।
একজন ধর্ষকের ঘরেও মা আছে, বোন আছে, মেয়ে আছে। কিন্তু সে যখন অন্যের মা-বোনের ইজ্জত নিয়ে খেলে, তখন সে আর মানুষ থাকে না।

তাই রাগ হয়। ক্ষোভে বুক ফেটে যায়। মনে হয়—ওর ঘর ভেঙে দিই, আগুন দিই।

কিন্তু এক মিনিট থামুন ভাই।
ওই ভাঙা ঘরে কি শুধু ধর্ষক থাকে? থাকে না তার ৭০ বছরের বৃদ্ধ বাবা? থাকে না তার অবুঝ ছেলেটা, যে স্কুলে যায়? থাকে না তার মা, যে কাঁদতে কাঁদতে বলবে, “আমার ছেলে এমন না।’
আমরা যদি রাগের মাথায় তাদের রাস্তায় নামিয়ে দিই, তাহলে অপরাধী আর আমাদের মধ্যে তফাৎটা কোথায় রইল?

আইন আছে বলেই তো আমরা মানুষ। নাহলে জঙ্গল আর সমাজ এক হয়ে যেত।

আবার রোজকার খবর খুললেই দেখি—ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি। রিকশাওয়ালার ২০০ টাকা, দোকানদারের দৈনিক ‘চাঁদা’।
এগুলোও ছোট অপরাধ না। এগুলো একটা জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। মানুষ রাতে ঘুমাতে পারে না।

আর সবচেয়ে কষ্টের জায়গা—ধর্ম।
কারও কথায়, কারও লেখায় আমাদের বিশ্বাসে আঘাত লাগলে রক্ত গরম হয়। হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তারপর?
আমরা প্রশাসনের কাছে না গিয়ে নিজেই বিচারক হয়ে যাই। নিজেই জল্লাদ হয়ে যাই।
কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দিই। ভাবি ‘ধর্মের সম্মান রক্ষা করলাম’।
অথচ যে ধর্ম আমাদের শিখিয়েছে ‘একটা প্রাণ বাঁচানো মানে গোটা মানবজাতিকে বাঁচানো’, সেই ধর্মের নামেই আমরা আরেকটা অপরাধ করে ফেলি।

তাহলে উপায় কী?

উপায় হলো—রাগ থাকবে, কিন্তু বিবেকও থাকবে। কঠিন হব, কিন্তু কোমলতাও হারাব না।

অপরাধীর শাস্তি হোক, পরিবারের না।
ধর্ষক, খুনি ও চাঁদাবাজ আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি পাক। মৃত্যুদণ্ড যদি আইনে থাকে, আদালত দিক। কিন্তু তার মা-বোনকে রাস্তায় ফেলবেন না। কারণ, তারাও এই সমাজেরই মানুষ। আজ আপনি যার ঘর ভাঙলেন, কাল আপনার বিপদে সেই ঘরের মানুষটাই পানি দিতে আসতে পারে।

আইন নিজের হাতে নয়, আইনের হাতে দিন।
ধর্ম নিয়ে কেউ কটূক্তি করলে থানায় যান, মামলা করুন। প্রশাসনকে চাপ দিন। কিন্তু নিজে লাশ পোড়ালে আপনি আর অপরাধীর মধ্যে পার্থক্য থাকল না। তখন আমরা সবাই একই গর্তে পড়ে যাব।

প্রতিরোধ গড়ে তুলুন, প্রতিশোধ না।
পাড়ায় পাড়ায় কমিটি করুন। ছিনতাই হলে সবাই মিলে ধরুন, পুলিশে দিন। চাঁদাবাজি দেখলে ভিডিও করুন, প্রচার করুন। কিন্তু ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলবেন না। কারণ, আজ আপনি যাকে মারলেন, কাল তার জায়গায় আপনার ভাইও থাকতে পারে—ভুল বোঝাবুঝিতে।

রাষ্ট্রের দায় সবচেয়ে বেশি। ক্ষমতায় যারা আছে, প্রশাসন যাদের হাতে—তাদের কাজ হলো মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া। দ্রুত বিচার দেওয়া। যেন মানুষকে রাস্তায় নেমে ‘বিচার বিচার’ বলে চিৎকার করতে না হয়।

শেষে একটা কথা।
আমরা সবাই মানুষ। রাগও করি, ভালোবাসতেও জানি।
ধর্ষণের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদী। ধর্মের অসম্মানের বিরুদ্ধেও আমরা একতাবদ্ধ।

কিন্তু এসব ‘প্রতিবাদ’ যেন মশাল নিয়ে না হয়ে, মোমবাতি নিয়ে হয়।
যেন আগুন দিয়ে না হয়ে, আইন দিয়ে হয়।

কারণ, যে সমাজ রাগের বশে ঘর পোড়ায়, সে সমাজ একদিন নিজের ঘরেই আগুন দেখে।
আর যে সমাজ বিবেক দিয়ে বিচার করে, সে সমাজই একদিন শান্তিতে ঘুমায়।

আসুন, আমরা অপরাধকে ঘৃণা করি। কিন্তু মানুষকে বাঁচিয়ে রাখি।
তাহলেই এই দেশটা সত্যিকারের ‘মানুষের দেশ’ হবে।

খন্দকার মো. জসীম উদ্দিন: কলাম লেখক

Tag :

আপনার মতামত প্রকাম করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার প্রদত্ত তথ্য আমাদের সার্ভারে সংরক্ষণ করা হবে

প্রকাশকের তথ্য

সর্বাধিক পঠিত

চট্টগ্রাম মডেল স্কুলে বক্তব্য ও রচনা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী

আইন হাতে তুলে না নিয়ে বিচার চাই – ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায়,,, খন্দকার মো. জসীম উদ্দিন: কলাম লেখক

প্রকাশের সময় : ১২:৪০:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

 

ধর্ষণ। শব্দটা উচ্চারণ করতেই গা শিউরে ওঠে।
এটা কোনো ভুল না, এটা পশুত্ব। এর কোনো অজুহাত নেই, কোনো তুলনা নেই।
একজন ধর্ষকের ঘরেও মা আছে, বোন আছে, মেয়ে আছে। কিন্তু সে যখন অন্যের মা-বোনের ইজ্জত নিয়ে খেলে, তখন সে আর মানুষ থাকে না।

তাই রাগ হয়। ক্ষোভে বুক ফেটে যায়। মনে হয়—ওর ঘর ভেঙে দিই, আগুন দিই।

কিন্তু এক মিনিট থামুন ভাই।
ওই ভাঙা ঘরে কি শুধু ধর্ষক থাকে? থাকে না তার ৭০ বছরের বৃদ্ধ বাবা? থাকে না তার অবুঝ ছেলেটা, যে স্কুলে যায়? থাকে না তার মা, যে কাঁদতে কাঁদতে বলবে, “আমার ছেলে এমন না।’
আমরা যদি রাগের মাথায় তাদের রাস্তায় নামিয়ে দিই, তাহলে অপরাধী আর আমাদের মধ্যে তফাৎটা কোথায় রইল?

আইন আছে বলেই তো আমরা মানুষ। নাহলে জঙ্গল আর সমাজ এক হয়ে যেত।

আবার রোজকার খবর খুললেই দেখি—ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি। রিকশাওয়ালার ২০০ টাকা, দোকানদারের দৈনিক ‘চাঁদা’।
এগুলোও ছোট অপরাধ না। এগুলো একটা জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। মানুষ রাতে ঘুমাতে পারে না।

আর সবচেয়ে কষ্টের জায়গা—ধর্ম।
কারও কথায়, কারও লেখায় আমাদের বিশ্বাসে আঘাত লাগলে রক্ত গরম হয়। হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তারপর?
আমরা প্রশাসনের কাছে না গিয়ে নিজেই বিচারক হয়ে যাই। নিজেই জল্লাদ হয়ে যাই।
কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দিই। ভাবি ‘ধর্মের সম্মান রক্ষা করলাম’।
অথচ যে ধর্ম আমাদের শিখিয়েছে ‘একটা প্রাণ বাঁচানো মানে গোটা মানবজাতিকে বাঁচানো’, সেই ধর্মের নামেই আমরা আরেকটা অপরাধ করে ফেলি।

তাহলে উপায় কী?

উপায় হলো—রাগ থাকবে, কিন্তু বিবেকও থাকবে। কঠিন হব, কিন্তু কোমলতাও হারাব না।

অপরাধীর শাস্তি হোক, পরিবারের না।
ধর্ষক, খুনি ও চাঁদাবাজ আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি পাক। মৃত্যুদণ্ড যদি আইনে থাকে, আদালত দিক। কিন্তু তার মা-বোনকে রাস্তায় ফেলবেন না। কারণ, তারাও এই সমাজেরই মানুষ। আজ আপনি যার ঘর ভাঙলেন, কাল আপনার বিপদে সেই ঘরের মানুষটাই পানি দিতে আসতে পারে।

আইন নিজের হাতে নয়, আইনের হাতে দিন।
ধর্ম নিয়ে কেউ কটূক্তি করলে থানায় যান, মামলা করুন। প্রশাসনকে চাপ দিন। কিন্তু নিজে লাশ পোড়ালে আপনি আর অপরাধীর মধ্যে পার্থক্য থাকল না। তখন আমরা সবাই একই গর্তে পড়ে যাব।

প্রতিরোধ গড়ে তুলুন, প্রতিশোধ না।
পাড়ায় পাড়ায় কমিটি করুন। ছিনতাই হলে সবাই মিলে ধরুন, পুলিশে দিন। চাঁদাবাজি দেখলে ভিডিও করুন, প্রচার করুন। কিন্তু ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলবেন না। কারণ, আজ আপনি যাকে মারলেন, কাল তার জায়গায় আপনার ভাইও থাকতে পারে—ভুল বোঝাবুঝিতে।

রাষ্ট্রের দায় সবচেয়ে বেশি। ক্ষমতায় যারা আছে, প্রশাসন যাদের হাতে—তাদের কাজ হলো মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া। দ্রুত বিচার দেওয়া। যেন মানুষকে রাস্তায় নেমে ‘বিচার বিচার’ বলে চিৎকার করতে না হয়।

শেষে একটা কথা।
আমরা সবাই মানুষ। রাগও করি, ভালোবাসতেও জানি।
ধর্ষণের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদী। ধর্মের অসম্মানের বিরুদ্ধেও আমরা একতাবদ্ধ।

কিন্তু এসব ‘প্রতিবাদ’ যেন মশাল নিয়ে না হয়ে, মোমবাতি নিয়ে হয়।
যেন আগুন দিয়ে না হয়ে, আইন দিয়ে হয়।

কারণ, যে সমাজ রাগের বশে ঘর পোড়ায়, সে সমাজ একদিন নিজের ঘরেই আগুন দেখে।
আর যে সমাজ বিবেক দিয়ে বিচার করে, সে সমাজই একদিন শান্তিতে ঘুমায়।

আসুন, আমরা অপরাধকে ঘৃণা করি। কিন্তু মানুষকে বাঁচিয়ে রাখি।
তাহলেই এই দেশটা সত্যিকারের ‘মানুষের দেশ’ হবে।

খন্দকার মো. জসীম উদ্দিন: কলাম লেখক