
এম নজরুল ইসলাম খান
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শিশু-কিশোরদের ওপর। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে করোনা মহামারির পর থেকে, শিশু-কিশোরদের মনোজগৎ, আচরণ, শিক্ষাগ্রহণের ধরণ, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামাজিক অংশগ্রহণে যে পরিবর্তন ঘটছে, তা শুধু শিক্ষকদের নয়—অভিভাবক, মনোবিজ্ঞানী, চিকিৎসক, সমাজবিজ্ঞানী এবং নীতিনির্ধারকদেরও গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। এটি আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি বৈশ্বিক ও জাতীয় বাস্তবতা।
প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগের তুলনায় অস্থিরতা, অধৈর্যতা, মনোযোগের ঘাটতি, পড়াশোনায় অনীহা, বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়া, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা, একাকীত্ব, আত্মবিশ্বাসের সংকট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপনের প্রবণতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক শিশু শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকলেও মানসিকভাবে পাঠে সম্পৃক্ত হতে পারছে না। শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা আগের চেয়ে অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে; অন্যদিকে অভিভাবকেরা সন্তানদের আচরণগত পরিবর্তন নিয়ে উদ্বিগ্ন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ (UNICEF), ইউনেসকো (UNESCO) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় করোনা-পরবর্তী সময়ে শিশু-কিশোরদের মানসিক চাপ, উদ্বেগ, একাকীত্ব, শেখার ক্ষতি (Learning Loss) এবং আচরণগত পরিবর্তন বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক জরিপ এবং জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে একই প্রবণতা উঠে এসেছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যালয় বন্ধ থাকা, মাঠে খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়া, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং অতিরিক্ত স্ক্রিননির্ভর জীবন শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
প্রযুক্তি আজকের বিশ্বের অপরিহার্য বাস্তবতা। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তি ব্যবহার শিশুদের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনলাইন গেম, শর্ট ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ভার্চুয়াল বিনোদনে সময় ব্যয় করার ফলে মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি, ভাষা বিকাশ, সৃজনশীলতা এবং বাস্তব সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘুমের ব্যাঘাত, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং মানসিক অস্থিরতাও বাড়ছে।
অন্যদিকে পরিবারেও পরিবর্তন এসেছে। বাবা-মায়ের কর্মব্যস্ততা, দাম্পত্য কলহ, সন্তানের সঙ্গে মানসম্মত সময়ের অভাব, পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা, অতিরিক্ত প্রত্যাশা, ফলাফলের চাপ, বুলিং, তুলনামূলক সমালোচনা এবং পারিবারিক অস্থিরতা শিশুদের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। অনেক শিশু নিজের কষ্ট প্রকাশ করতে না পেরে নীরবে ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে শ্রেণিকক্ষের আচরণ, ফলাফল এবং সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে।
আজকের শিক্ষককেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে। কেবল পাঠদান নয়, শিক্ষার্থীর মনস্তত্ত্ব বোঝা, সহানুভূতিশীল আচরণ, আনন্দময় ও অংশগ্রহণমূলক পাঠদান, পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিজ্ঞানচর্চা এবং সৃজনশীল কার্যক্রমের সুযোগ বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। বিদ্যালয়ে প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত।
অভিভাবকদেরও মনে রাখতে হবে—সন্তানের জীবনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দামি মোবাইল ফোন নয়, বরং বাবা-মায়ের ভালোবাসা, সময়, ধৈর্য এবং আন্তরিক সঙ্গ। প্রতিদিন সন্তানের সঙ্গে কথা বলা, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, নিয়মিত খেলাধুলায় উৎসাহ দেওয়া, প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমা নির্ধারণ এবং ফলাফলের চেয়ে শেখার আনন্দকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
রাষ্ট্র ও সমাজেরও দায়িত্ব কম নয়। প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিশুবান্ধব পরিবেশ, নিরাপদ খেলার মাঠ, গ্রন্থাগার, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রম, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং অভিভাবক সচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও শিশুদের জন্য ইতিবাচক ও শিক্ষামূলক বিষয়বস্তু প্রচারে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বদলে যাওয়া শিশুমনকে দোষারোপ নয়, বুঝতে হবে। কারণ আজকের শিশুই আগামী দিনের নাগরিক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, বিচারক, উদ্যোক্তা ও রাষ্ট্রনায়ক। তাদের সুস্থ মনন, মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও মানসিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা মানে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা।
শিশুমন বদলাচ্ছে—এটি বাস্তবতা। কিন্তু সেই পরিবর্তনকে ইতিবাচক পথে পরিচালিত করার দায়িত্ব আমাদের সবার। পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র যদি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে, তবে বদলে যাওয়া এই প্রজন্মই একদিন একটি মানবিক, জ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তিবান্ধব এবং মূল্যবোধসম্পন্ন বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।
(লেখক : সাংবাদিক ও শিক্ষক)
এম নজরুল ইসলাম খান, লেখক, শিক্ষক, ও সাংবাদিক নেতা 








