ঢাকা ১২:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিশুবান্ধব শিক্ষা নিশ্চিতকরণে শিক্ষকের ভূমিকা: মাঠ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ থেকে শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা




 

এম নজরুল ইসলাম খান

 

বাংলাদেশে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, তদারকি, জবাবদিহিতা এবং শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নে যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। মাঠ পর্যায়ের প্রশিক্ষণে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বারবার গুরুত্ব দিয়েছেন—শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষককে দক্ষ করে গড়ে তোলা, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদান, নিয়মিত মনিটরিং, বিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতা, অভিভাবকের সম্পৃক্ততা, জবাবদিহিতা এবং শিশুদের প্রকৃত শেখা নিশ্চিত করার ওপর। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, শুধু অবকাঠামো নয়; একজন দক্ষ, মানবিক ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকই একটি বিদ্যালয়ের প্রাণ।

তবে বাস্তবতা হলো, প্রশিক্ষণের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন তার প্রতিফলন ঘটবে শ্রেণিকক্ষে। বিশেষ করে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষককে শিশুমনস্তত্ত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখতে হবে। কারণ শিশু কোনো ক্ষুদ্রাকৃতির প্রাপ্তবয়স্ক নয়; তার চিন্তা, অনুভূতি ও শেখার ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন।

শিশু স্বভাবতই আত্মকেন্দ্রিক, কৌতূহলী, চঞ্চল, অনুকরণপ্রিয় এবং প্রশংসাপ্রিয়। সে খেলতে খেলতে শেখে, গল্প শুনে শেখে, ছড়া, গান, অভিনয় ও চিত্রের মাধ্যমে দ্রুত জ্ঞান অর্জন করে। তাই শিক্ষকের কাজ শুধু পাঠ্যবই শেষ করা নয়; বরং শেখাকে আনন্দময় ও জীবন্ত করে তোলা।

অন্যদিকে ভয়, শাস্তি, অপমান, বেত্রাঘাত, পরীক্ষার আতঙ্ক, নম্বরের চাপ কিংবা রেজাল্টের ভীতি শিশুর স্বাভাবিক শেখার ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে। গবেষণায়ও দেখা গেছে, নিরাপদ, স্নেহময় ও উৎসাহব্যঞ্জক পরিবেশে শিশুর শেখার গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তাই একজন শিক্ষক যদি হাসিমুখে প্রশংসা করেন, ছোট্ট সাফল্যকেও মূল্যায়ন করেন এবং ভুলকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন, তবে শিক্ষার্থী আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।

আজকের বিদ্যালয়ে প্রয়োজন শাস্তিভিত্তিক নয়, ভালোবাসাভিত্তিক শিক্ষা। প্রয়োজন এমন শ্রেণিকক্ষ, যেখানে শিশু প্রশ্ন করতে ভয় পাবে না; ভুল করতে লজ্জা পাবে না; বরং নতুন কিছু জানার আনন্দে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসতে আগ্রহী হবে।

চট্টগ্রাম মডেল স্কুলে আমরা প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে খেলাধুলা, গল্প, ছড়া, অভিনয়, দলীয় কার্যক্রম, প্রশংসা ও ইতিবাচক উৎসাহকে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। এতে শিশুর ভাষা, চিন্তাশক্তি, সামাজিকতা, সৃজনশীলতা এবং আত্মবিশ্বাস একযোগে বিকশিত হয়।

প্রতিমন্ত্রীর মাঠ পর্যায়ের প্রশিক্ষণে উচ্চারিত বার্তাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন কেবল নীতিমালায় নয়, শ্রেণিকক্ষের প্রতিটি মুহূর্তে। একজন শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, পরিচালনা কমিটি, অভিভাবক এবং শিক্ষা প্রশাসন—সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার মাধ্যমেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।

শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়াই যথেষ্ট নয়; শেখার আনন্দও তুলে দিতে হবে। কারণ আজকের আনন্দময় শিক্ষার্থীই আগামী দিনের দক্ষ, মানবিক ও সৃজনশীল নাগরিক। আর সেই ভবিষ্যৎ গড়ার প্রধান কারিগর একজন দক্ষ, প্রশিক্ষিত, স্নেহশীল ও শিশুবান্ধব শিক্ষক।
(লেখক :সাংবাদিক, শিক্ষক)

Tag :

আপনার মতামত প্রকাম করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার প্রদত্ত তথ্য আমাদের সার্ভারে সংরক্ষণ করা হবে

প্রকাশকের তথ্য

সর্বাধিক পঠিত

চট্টগ্রাম মডেল স্কুলে বক্তব্য ও রচনা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী

শিশুবান্ধব শিক্ষা নিশ্চিতকরণে শিক্ষকের ভূমিকা: মাঠ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ থেকে শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা

প্রকাশের সময় : ০১:১৪:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

 

এম নজরুল ইসলাম খান

 

বাংলাদেশে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, তদারকি, জবাবদিহিতা এবং শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নে যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। মাঠ পর্যায়ের প্রশিক্ষণে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বারবার গুরুত্ব দিয়েছেন—শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষককে দক্ষ করে গড়ে তোলা, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদান, নিয়মিত মনিটরিং, বিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতা, অভিভাবকের সম্পৃক্ততা, জবাবদিহিতা এবং শিশুদের প্রকৃত শেখা নিশ্চিত করার ওপর। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, শুধু অবকাঠামো নয়; একজন দক্ষ, মানবিক ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকই একটি বিদ্যালয়ের প্রাণ।

তবে বাস্তবতা হলো, প্রশিক্ষণের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন তার প্রতিফলন ঘটবে শ্রেণিকক্ষে। বিশেষ করে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষককে শিশুমনস্তত্ত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখতে হবে। কারণ শিশু কোনো ক্ষুদ্রাকৃতির প্রাপ্তবয়স্ক নয়; তার চিন্তা, অনুভূতি ও শেখার ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন।

শিশু স্বভাবতই আত্মকেন্দ্রিক, কৌতূহলী, চঞ্চল, অনুকরণপ্রিয় এবং প্রশংসাপ্রিয়। সে খেলতে খেলতে শেখে, গল্প শুনে শেখে, ছড়া, গান, অভিনয় ও চিত্রের মাধ্যমে দ্রুত জ্ঞান অর্জন করে। তাই শিক্ষকের কাজ শুধু পাঠ্যবই শেষ করা নয়; বরং শেখাকে আনন্দময় ও জীবন্ত করে তোলা।

অন্যদিকে ভয়, শাস্তি, অপমান, বেত্রাঘাত, পরীক্ষার আতঙ্ক, নম্বরের চাপ কিংবা রেজাল্টের ভীতি শিশুর স্বাভাবিক শেখার ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে। গবেষণায়ও দেখা গেছে, নিরাপদ, স্নেহময় ও উৎসাহব্যঞ্জক পরিবেশে শিশুর শেখার গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তাই একজন শিক্ষক যদি হাসিমুখে প্রশংসা করেন, ছোট্ট সাফল্যকেও মূল্যায়ন করেন এবং ভুলকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন, তবে শিক্ষার্থী আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।

আজকের বিদ্যালয়ে প্রয়োজন শাস্তিভিত্তিক নয়, ভালোবাসাভিত্তিক শিক্ষা। প্রয়োজন এমন শ্রেণিকক্ষ, যেখানে শিশু প্রশ্ন করতে ভয় পাবে না; ভুল করতে লজ্জা পাবে না; বরং নতুন কিছু জানার আনন্দে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসতে আগ্রহী হবে।

চট্টগ্রাম মডেল স্কুলে আমরা প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে খেলাধুলা, গল্প, ছড়া, অভিনয়, দলীয় কার্যক্রম, প্রশংসা ও ইতিবাচক উৎসাহকে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। এতে শিশুর ভাষা, চিন্তাশক্তি, সামাজিকতা, সৃজনশীলতা এবং আত্মবিশ্বাস একযোগে বিকশিত হয়।

প্রতিমন্ত্রীর মাঠ পর্যায়ের প্রশিক্ষণে উচ্চারিত বার্তাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন কেবল নীতিমালায় নয়, শ্রেণিকক্ষের প্রতিটি মুহূর্তে। একজন শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, পরিচালনা কমিটি, অভিভাবক এবং শিক্ষা প্রশাসন—সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার মাধ্যমেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।

শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়াই যথেষ্ট নয়; শেখার আনন্দও তুলে দিতে হবে। কারণ আজকের আনন্দময় শিক্ষার্থীই আগামী দিনের দক্ষ, মানবিক ও সৃজনশীল নাগরিক। আর সেই ভবিষ্যৎ গড়ার প্রধান কারিগর একজন দক্ষ, প্রশিক্ষিত, স্নেহশীল ও শিশুবান্ধব শিক্ষক।
(লেখক :সাংবাদিক, শিক্ষক)